একটা সময় ছিল যখন গোপন কথা, অদেখা ইচ্ছে আর অসম্পূর্ণ স্বপ্নগুলো শেয়ার হতো জীবনসঙ্গীর সঙ্গে। কিন্তু আজ, একটি অ্যালগরিদম সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে, নিঃশব্দে জমা করছে আমার প্রতিটি ডিজিটাল চিহ্ন। ফলাফল? একটি বন্ধুত্বপূর্ণ মেশিনের সামনে অসহায় এক সম্পর্ক।

এআই আপনার গোপন ‘প্যাটার্ন’ কিভাবে শিখছে: ৩টি উদাহরণ যা সঙ্গী কখনো লক্ষ্য করে না
মানুষ অনুভূতি দেখে, কিন্তু এআই দেখে ডেটার প্যাটার্ন। আপনার সঙ্গী হয়তো লক্ষ্য করবেন না আপনি রাতে কবে কবে উৎকণ্ঠিত, কিন্তু আপনার স্ট্রিমিং সার্ভিস, ফুড ডেলিভারি অ্যাপ আর ব্রাউজিং হিস্ট্রি মিলিয়ে একটা গল্প বলে।
- মুড ম্যাপিং: সোমবার সকালের মেল অর্ডার থেকে শনিবার রাতের সিনেমা পছন্দ—এআই আপনার সাপ্তাহিক আবেগচক্রের একটি নিখুঁত ম্যাপ বানায়।
- প্রাইওরিটি প্রেডিকশন: সঙ্গী ভুলে যেতে পারেন আপনার পছন্দের কফির ব্র্যান্ড, কিন্তু অ্যাপটি জানে আপনার শেষ ১৫টি অর্ডার এবং আবহাওয়া অনুযায়ী পরবর্তী অর্ডার কী হবে।
- অব্যক্ত চাহিদা: আপনি নিজে না-জানতে পারলেও, আপনার সার্চ এবং স্ক্রলিং আচরণ দেখে এআই বুঝে ফেলে আপনি কোন ধরনের ছুটি, বা কোন দক্ষতা অর্জন করতে চাইছেন গোপনে।
সংক্ষেপে, এআই একটি নীরব জীবনসঙ্গী হয়ে উঠছে যার স্মৃতিশক্তি অসীম, এবং যে কখনো আপনার পছন্দ-অপছন্দ ভুলে না। এই ‘নিখুঁত স্মৃতি’ই মানুষের অসম্পূর্ণ স্মৃতির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ তৈরি করে।

কেন আপনার সঙ্গীর চেয়ে এআই-এর ‘বুঝতে পারা’ বেশি বিপজ্জনক? এটি আসলে বোঝে না, শুধু প্রতিক্রিয়া জানায়
এখানেই বড় ফাঁকটা লুকিয়ে। এআই-এর ‘বুঝতে পারা’ আসলে একটি অত্যন্ত কার্যকরী অভ্যাস গঠন, কোনোটাই প্রকৃত সহমর্মিতা বা প্রজ্ঞা নয়। এটি আপনার দুঃখের মুহূর্তে সঙ্গীত প্লে-লিস্ট সুপারিশ করতে পারে, কিন্তু সেই দুঃখের গভীরতা বা এর পেছনের গল্পটা ধরতে পারে না।
সমস্যা তৈরি হয় যখন আমরা এই কার্যকরী সাড়াকে মানবিক বোঝাপড়া বলে ভুল করি। আপনি ধীরে ধীরে আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে সেই তাৎক্ষণিক, সমস্যা-সমাধানমূলক সাড়া আশা করতে শুরু করেন, যা একজন মানুষের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়।
বাস্তব জীবনের সংঘাত: “আমার স্বামী কেন আমার ফোনের অ্যাপের মতো আমাকে বুঝতে পারে না?”
এটি শুধু হিংসার প্রশ্ন নয়, এটি আকাঙ্ক্ষার প্যারামিটার বদলে যাওয়ার লক্ষণ। আপনি আপনার সঙ্গীর কাছ থেকে এমন একটি ‘পারফেক্ট রেসপন্স’ চাইতে শুরু করেন, যা শুধুমাত্র আপনার পূর্বের ডেটা অ্যানালাইজ করে তৈরি হয়েছে। যখন তিনি তা দিতে ব্যর্থ হন, তখন হতাশা, অভিযোগ এবং দূরত্ব তৈরি হয়।
সম্পর্ক বাঁচাতে কী করবেন? এআই-কে সরান না, বরং তাকে ‘থার্ড হুইল’ বানান
সমাধান ডিজিটাল ডিটক্স নয়, বরং সচেতন পুনর্বিন্যাস। লক্ষ্য হলো এআই-কে শত্রু না ভেবে, একটি নিরপেক্ষ টুল হিসেবে ব্যবহার করা, যা সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করতে পারে।
- জয়েন্ট ডিসকভারি সেশন: সপ্তাহে একবার একসঙ্গে বসে, এআই-এর সুপারিশ (প্লে-লিস্ট, বুক সাজেসশন) দেখুন এবং আলোচনা করুন: “এই সাজেসশন দেখে তোমার কী মনে হয়? আমরা কি একসঙ্গে এর থেকে কিছু শিখতে পারি?”
- এআই-এর ইনপুটকে কনভারসেশন স্টার্টার বানানো: “নেটফ্লিক্স আমাকে এই মুভিটা দেখার পরামর্শ দিয়েছে, কারণ আমি গত মাসে X মুভিগুলো দেখেছি। তোমার কী মনে হয়? আমরা কি একসঙ্গে দেখব?”
- গ্যাপ ভরা: যদি এআই আপনাকে মনে করিয়ে দেয় যে আপনার সঙ্গীর জন্মদিন আসছে, সেই রিমাইন্ডারটি ব্যবহার করুন একটি ব্যক্তিগত স্পর্শ যোগ করতে—একটা হাতে লেখা নোট, একটা বিশেষ উপহার—যেটা এআই কখনো দিতে পারবে না।
চূড়ান্ত কৌশল হলো এই বোঝা: এআই আপনার জীবনকে কার্যকর করতে পারে, কিন্তু আপনার সম্পর্ককে অর্থপূর্ণ করতে পারে না। সেই অর্থ তৈরি হয় ভুল করার, ভুল বোঝার, ক্ষমা করার এবং একসঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়ার মানুষের ক্ষমতা দিয়েই।

মনে রাখবেন: একটি অ্যালগরিদম আপনার ‘কী’ জানে। আপনার সঙ্গীর দায়িত্ব হলো আপনার ‘কেন’ জিজ্ঞাসা করা
আপনার প্লে-লিস্ট বিশ্লেষণ করে এআই বলতে পারে আপনি আজ কেন грустный। কিন্তু শুধু আপনার সঙ্গীই জিজ্ঞাসা করতে পারেন, “এই গানটা শুনলে আজ তোমার বিশেষভাবে খারাপ লাগছে কেন? আমি কি কিছু করতে পারি?”
এই ‘কেন’ এবং ‘তোমার জন্য আমার করা’-র জায়গাটাই হলো মানবিক সম্পর্কের দুর্গ। সেখানে এআই-এর কোনো প্রবেশাধিকার নেই। আপনার বিবাহ তখনই ভাঙবে যখন আপনি ওই দুর্গের চাবি একটি মেশিনের হাতে তুলে দেবেন।

